জহির রায়হানের অন্তর্ধান: ৫৪ বছর পর আজও অধরা সেই রহস্য
- আপডেট সময় : ০২:৩৩:০৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে
৩০ জানুয়ারি ২০২৬। ৫৪ বছর আগে, ১৯৭২ সালের ঠিক এই দিনটিতেই স্বাধীন বাংলাদেশে নিখোঁজ হয়েছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রাণপুরুষ ও বুদ্ধিজীবী জহির রায়হান। যুদ্ধবিজয়ের মাত্র দেড় মাসের মাথায় বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে মিরপুরের কাদামাটিতে হারিয়ে যান এই কিংবদন্তি। অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও তার অন্তর্ধান রহস্য আজও দেশের ইতিহাসের এক অমীমাংসিত অধ্যায়।
মাত্র ৩৬ বছরের জীবনে জহির রায়হান বাংলা চলচ্চিত্রকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। ১৯৫৭ সালে সহকারী হিসেবে পথচলা শুরু করা এই নির্মাতা ১৯৬১ সালে ‘কখনও আসেনি’ ছবির মাধ্যমে পরিচালনায় আসেন। তিনি নির্মাণ করেন পাকিস্তানের প্রথম রঙিন ছবি ‘সংগম’ ও সিনেমাস্কোপ ছবি ‘বাহানা’ (১৯৬৫)। তবে তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০), যা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের এক অনন্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তার নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জহির রায়হান হন্যে হয়ে খুঁজছিলেন আলবদরদের হাতে অপহৃত বড় ভাই লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারকে। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি সকালে রফিক নামের এক অজ্ঞাত ব্যক্তির ফোনকলে তিনি জানতে পারেন, মিরপুর ১২ নম্বরে তার ভাই বন্দী আছেন। মিরপুর তখনও ছিল বিহারি ও পাকিস্তানি সেনাদের দখলে এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে। খবর পেয়েই জহির ছুটে যান সেখানে।
জানা যায়, মিরপুর-২ নম্বর সেকশনে পৌঁছানোর পর নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে পুলিশের সাথে ভেতরে যেতে দেওয়া হয় এবং এরপর তিনি আর ফিরে আসেননি। আবার কেউ কেউ বলেন, সেদিন মিরপুরে অস্ত্র উদ্ধারে গিয়েছিল সেনাবাহিনী ও পুলিশের দল। সেখানে তাদের সঙ্গে ভিড়ে যান জহির রায়হান।
জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে গত ৫ দশকে নানা তত্ত্ব ও বিতর্ক উঠে এসেছে। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও প্রচলিত তত্ত্বটি হলো, মিরপুরে লুকিয়ে থাকা পাকিস্তানি সেনা ও তাদের বিহারি দোসরদের অতর্কিত হামলায় তিনি নিহত হন।
মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অব.) তার ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য’ বইতে উল্লেখ করেছেন যে, সেদিন মিরপুরে সেনাবাহিনীর একটি অপারেশনের সময় জহির রায়হান ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন এবং গোলাগুলির মধ্যে পড়ে যান। এছাড়া, ১৯৯৯ সালে দৈনিক ভোরের কাগজের সাংবাদিক জুলফিকার আলী মানিকের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষদর্শী নায়েক আমির হোসেনের বরাতে বলা হয়, তিনি জহির রায়হানকে গুলিবিদ্ধ হতে দেখেছেন এবং মিরপুরেই তাকে গণকবর দেয়া হতে পারে।

জহির রায়হানের অন্তর্ধান নিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী গুঞ্জন বা কন্সপিরেসি থিওরি রয়েছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, জহির রায়হানের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার এমন কিছু গোপন ভিডিও ফুটেজ বা নথিপত্র ছিল, যা ‘মিসিং ক্যান অফ ফিল্ম’ নামে পরিচিত, যেখানে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নেতিবাচক ভূমিকা বা ষড়যন্ত্রের প্রমাণ ছিল।
ধারণা করা হয়, সেই প্রমাণ ধামাচাপা দিতেই তাকে পরিকল্পিতভাবে মিরপুরে ডেকে নিয়ে হত্যা বা গুম করা হয়। যদিও এই তত্ত্বের শক্ত কোনো প্রমাণ মেলেনি তবুও এটি নিয়ে আলোচনা থেমে নেই। সম্প্রতি নাঈম মোহাইমেন ‘আ মিসিং ক্যান অব ফিল্ম’ নামে একটি চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছেন, যা এই রহস্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত।
৫৪ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু জহির রায়হানের মতো এক ধ্রুবতারা ঠিক কোথায়, কীভাবে নিভে গেলেন, তার কোনো রাষ্ট্রীয় সুরাহা আজও হয়নি। তার পরিবার ও ভক্তরা আজও অপেক্ষা করে আছেন সেই সত্যটি জানার জন্য।
সূত্রঃ jamuna.tv

















