ঢাকা ১২:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬, ২৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

শিশুদের মসজিদে আনয়নে মমতা ও শৃঙ্খলার ভারসাম্য

news desk
  • আপডেট সময় : ০৩:৩৫:৩০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
সংবাদ সমাচারের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আমাদের সমাজে উত্সবমুখর ইবাদতগুলোতে শিশু-কিশোরদের মসজিদে নিয়ে আসার রেওয়াজ  রয়েছে। বিশেষত তারাবি, জুমা, ঈদ বা বিশেষ কোনো ফজিলতপূর্ণ দিনে। কিন্তু শিশুরা চঞ্চল হয়, তারা স্থির হয়ে দীর্ঘ সময় বসে থাকতে পারে না, শিশুসুলভ আচরণ; হাসিতামাশা বা দুষ্টুমি করে বসে, যা অনেক সময়  মসজিদের আদবের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয় না। তাই শিশুদের মসজিদে আনয়নে মুসল্লিদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। 

সমস্যা হচ্ছে এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির প্রবণতা বিদ্যমান। প্রথমত, কিছু মানুষ মনে করেন, মসজিদে সামান্য শব্দও অমার্জনীয় অপরাধ; শিশুরা একটু নড়াচড়া করলেই কঠোর ধমক, তিরস্কার, এমনকি অপমান করে বসেন এবং শিশুদের মসজিদে আনয়নে নিরুত্সাহিত করেন।

দ্বিতীয়ত, অন্যকিছু মানুষ আবার শিশুদের যেকোনো আচরণকে ‘রহমত’, ‘বরকত’ ইত্যাদি বলে এমনভাবে মহিমান্বিত করেন, যেন ইবাদতে বিঘ্নতা সৃষ্টি করা কোনো দূষণীয় বিষয় নয়। 
অথচ বলাই বাহুল্য যে, দুইটি মনোভাবই প্রান্তিক এবং পরিত্যাজ্য। ইসলামের শিক্ষা সবসময়ই ভারসাম্যের শিক্ষা। মসজিদ যেহেতু ইবাদতের ঘর, তাই যেমনি এর আদব ও পবিত্রতা রক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে মসজিদ হলো ভবিষ্যত্ প্রজন্মের ঈমানি শিক্ষার প্রথম পাঠশালা। তাই তাদেরকে বিতাড়িত করাও সমীচীন নয়।

নববী দৃষ্টান্ত: কোমলতা ও শৃঙ্খলার সমন্বয়
আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের প্রতি ছিলেন অসাধারণ স্নেহশীল। তিনি নাতি হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে কাঁধে তুলে নিয়েছেন, সিজদায় গেলে তারা পিঠে চড়ে বসলে সিজদা দীর্ঘ করেছেন।

হাদিসে এসেছে হাসান ও হুসাইন (রা.) নামাজ চলাকালীন পিঠে চড়ে বসতেন। মানুষ তাদের সরাতে চাইলে নবী বলতেন, ‘তাদের ছেড়ে দাও। আল্লাহর শপথ! আমাকে যে ভালোবাসে, সে যেন তাদেরকেও ভালোবাসে।’ (বায়হাকি, হাদিস: ৩২৩৭)

একবার সালাতে থাকা অবস্থায় শিশুর কান্না শুনে নামাজ সংক্ষিপ্তও করেছেন, যাতে মায়ের কষ্ট না হয়। 
কিন্তু একই সঙ্গে তিনি মসজিদের আদবও শিক্ষা দিয়েছেন। মসজিদকে পরিচ্ছন্ন রাখা, অপ্রয়োজনীয় ও উচ্চস্বরে কথা না বলা, অন্যের ইবাদতে বিঘ্ন না ঘটানো—এসব ছিল তাঁর সুস্পষ্ট নির্দেশনা। নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের মসজিদকে অবোধ শিশু, পাগল, দুষ্কৃতকারী, বেচাকেনা, ঝগড়া-বিবাদ, হৈ-চৈ, হদ কায়েম এবং অস্ত্রশস্ত্রের উত্তোলন থেকে হিফাজতে রাখবে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৭৫০)।  যাতে করে মাসজিদের পবিত্রতা ও আদব বজায় থাকে।
অর্থাত্ শিশুর প্রতি মমতা যেমন ছিল, তেমনি ছিল ইবাদতের পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ববোধ।

বয়সভিত্তিক দিকনির্দেশনা (ফিকহি বিশ্লেষণ)
হানাফি ফিকহের আলেমগণ নবীজি (সা.)-এর এই সমন্বয়কে বিবেচনা করে বয়স ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে  শিশুদেরকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন,
১. অতি অল্পবয়সী শিশু: যারা মসজিদের মর্যাদা বোঝে না, টয়লেট ট্রেইনড নয়, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে দৌড়ঝাঁপ করে। যদি প্রবল আশঙ্কা থাকে যে তারা মসজিদ নাপাক করবে বা গুরুতর বিঘ্ন ঘটাবে, তাহলে তাদের আনা বৈধ নয়। শিশুদের মসজিদে আনা নিষিদ্ধের হাদিসটি ফকিহগণ উক্ত প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করেছেন।

২. মধ্যম বয়স (৭-১১ বছর): এরা আংশিক বোঝাপড়া রাখে। এদের আনা সাধারণত জায়েজ এবং প্রশিক্ষণের অংশ। তবে যদি মারাত্মক বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা থাকে, না আনা উত্তম। অভিভাবকের তদারকি এখানে মুখ্য।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘সাত বছর বয়স হলে শিশুকে নামাজের আদেশ দাও এবং দশ বছর হলে প্রয়োজনে মৃদু প্রহার করতে পারো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৪০৭)
আরেক বর্ণনায় এসেছে, ‘শিশুরা যখন ডান-বাম বুঝতে শুরু করে, তখন তাদেরকে নামাজের নির্দেশ প্রদান করবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৭)

৩. বালেগের নিকটবর্তী (১২-১৪ বছর): এদের নিয়মিত মসজিদে আনা জরুরি। কারণ বালেগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সালাত ফরজ হয়। আগে থেকে অভ্যাস না হলে পরবর্তীতে তা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই অভিভাকদের দায়িত্ব হলো, মোটামুটি বুঝমান শিশুদের মসজিদের আদব সম্পর্কে সতর্ক করা ও মসজিদে আনা। বর্তমান প্রজন্ম দুনিয়াবী ব্যস্ততা এবং তথ্যপ্রযুক্তির মন্দ ব্যবহারের ফলে ক্রমান্বয়ে দ্বীন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং নীতি-নৈতিকতা ভুলে অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে। এহেন পরিস্থিতিতে সুন্দর ও অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনে শিশুদের মসজিদে গমন খুবই জরুরি। তাই শিশুদের মসজিদে আনার আগে অবশ্যই মসজিদের আদব সম্পর্কে বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে। এ ব্যাপারে অন্যান্য মুসল্লিরাও দায়িত্বশীল ও সংযত আচরণ করতে হবে। কোনো শিশুর অতিরিক্ত দুষ্টমির কারণে নামাজে ব্যাঘাত যাতে না ঘটে, কৌশলে সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

সূত্রঃ news24bd.tv

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

শিশুদের মসজিদে আনয়নে মমতা ও শৃঙ্খলার ভারসাম্য

আপডেট সময় : ০৩:৩৫:৩০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬

আমাদের সমাজে উত্সবমুখর ইবাদতগুলোতে শিশু-কিশোরদের মসজিদে নিয়ে আসার রেওয়াজ  রয়েছে। বিশেষত তারাবি, জুমা, ঈদ বা বিশেষ কোনো ফজিলতপূর্ণ দিনে। কিন্তু শিশুরা চঞ্চল হয়, তারা স্থির হয়ে দীর্ঘ সময় বসে থাকতে পারে না, শিশুসুলভ আচরণ; হাসিতামাশা বা দুষ্টুমি করে বসে, যা অনেক সময়  মসজিদের আদবের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয় না। তাই শিশুদের মসজিদে আনয়নে মুসল্লিদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। 

সমস্যা হচ্ছে এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির প্রবণতা বিদ্যমান। প্রথমত, কিছু মানুষ মনে করেন, মসজিদে সামান্য শব্দও অমার্জনীয় অপরাধ; শিশুরা একটু নড়াচড়া করলেই কঠোর ধমক, তিরস্কার, এমনকি অপমান করে বসেন এবং শিশুদের মসজিদে আনয়নে নিরুত্সাহিত করেন।

দ্বিতীয়ত, অন্যকিছু মানুষ আবার শিশুদের যেকোনো আচরণকে ‘রহমত’, ‘বরকত’ ইত্যাদি বলে এমনভাবে মহিমান্বিত করেন, যেন ইবাদতে বিঘ্নতা সৃষ্টি করা কোনো দূষণীয় বিষয় নয়। 
অথচ বলাই বাহুল্য যে, দুইটি মনোভাবই প্রান্তিক এবং পরিত্যাজ্য। ইসলামের শিক্ষা সবসময়ই ভারসাম্যের শিক্ষা। মসজিদ যেহেতু ইবাদতের ঘর, তাই যেমনি এর আদব ও পবিত্রতা রক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে মসজিদ হলো ভবিষ্যত্ প্রজন্মের ঈমানি শিক্ষার প্রথম পাঠশালা। তাই তাদেরকে বিতাড়িত করাও সমীচীন নয়।

নববী দৃষ্টান্ত: কোমলতা ও শৃঙ্খলার সমন্বয়
আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের প্রতি ছিলেন অসাধারণ স্নেহশীল। তিনি নাতি হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে কাঁধে তুলে নিয়েছেন, সিজদায় গেলে তারা পিঠে চড়ে বসলে সিজদা দীর্ঘ করেছেন।

হাদিসে এসেছে হাসান ও হুসাইন (রা.) নামাজ চলাকালীন পিঠে চড়ে বসতেন। মানুষ তাদের সরাতে চাইলে নবী বলতেন, ‘তাদের ছেড়ে দাও। আল্লাহর শপথ! আমাকে যে ভালোবাসে, সে যেন তাদেরকেও ভালোবাসে।’ (বায়হাকি, হাদিস: ৩২৩৭)

একবার সালাতে থাকা অবস্থায় শিশুর কান্না শুনে নামাজ সংক্ষিপ্তও করেছেন, যাতে মায়ের কষ্ট না হয়। 
কিন্তু একই সঙ্গে তিনি মসজিদের আদবও শিক্ষা দিয়েছেন। মসজিদকে পরিচ্ছন্ন রাখা, অপ্রয়োজনীয় ও উচ্চস্বরে কথা না বলা, অন্যের ইবাদতে বিঘ্ন না ঘটানো—এসব ছিল তাঁর সুস্পষ্ট নির্দেশনা। নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের মসজিদকে অবোধ শিশু, পাগল, দুষ্কৃতকারী, বেচাকেনা, ঝগড়া-বিবাদ, হৈ-চৈ, হদ কায়েম এবং অস্ত্রশস্ত্রের উত্তোলন থেকে হিফাজতে রাখবে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৭৫০)।  যাতে করে মাসজিদের পবিত্রতা ও আদব বজায় থাকে।
অর্থাত্ শিশুর প্রতি মমতা যেমন ছিল, তেমনি ছিল ইবাদতের পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ববোধ।

বয়সভিত্তিক দিকনির্দেশনা (ফিকহি বিশ্লেষণ)
হানাফি ফিকহের আলেমগণ নবীজি (সা.)-এর এই সমন্বয়কে বিবেচনা করে বয়স ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে  শিশুদেরকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন,
১. অতি অল্পবয়সী শিশু: যারা মসজিদের মর্যাদা বোঝে না, টয়লেট ট্রেইনড নয়, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে দৌড়ঝাঁপ করে। যদি প্রবল আশঙ্কা থাকে যে তারা মসজিদ নাপাক করবে বা গুরুতর বিঘ্ন ঘটাবে, তাহলে তাদের আনা বৈধ নয়। শিশুদের মসজিদে আনা নিষিদ্ধের হাদিসটি ফকিহগণ উক্ত প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করেছেন।

২. মধ্যম বয়স (৭-১১ বছর): এরা আংশিক বোঝাপড়া রাখে। এদের আনা সাধারণত জায়েজ এবং প্রশিক্ষণের অংশ। তবে যদি মারাত্মক বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা থাকে, না আনা উত্তম। অভিভাবকের তদারকি এখানে মুখ্য।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘সাত বছর বয়স হলে শিশুকে নামাজের আদেশ দাও এবং দশ বছর হলে প্রয়োজনে মৃদু প্রহার করতে পারো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৪০৭)
আরেক বর্ণনায় এসেছে, ‘শিশুরা যখন ডান-বাম বুঝতে শুরু করে, তখন তাদেরকে নামাজের নির্দেশ প্রদান করবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৭)

৩. বালেগের নিকটবর্তী (১২-১৪ বছর): এদের নিয়মিত মসজিদে আনা জরুরি। কারণ বালেগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সালাত ফরজ হয়। আগে থেকে অভ্যাস না হলে পরবর্তীতে তা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই অভিভাকদের দায়িত্ব হলো, মোটামুটি বুঝমান শিশুদের মসজিদের আদব সম্পর্কে সতর্ক করা ও মসজিদে আনা। বর্তমান প্রজন্ম দুনিয়াবী ব্যস্ততা এবং তথ্যপ্রযুক্তির মন্দ ব্যবহারের ফলে ক্রমান্বয়ে দ্বীন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং নীতি-নৈতিকতা ভুলে অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে। এহেন পরিস্থিতিতে সুন্দর ও অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনে শিশুদের মসজিদে গমন খুবই জরুরি। তাই শিশুদের মসজিদে আনার আগে অবশ্যই মসজিদের আদব সম্পর্কে বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে। এ ব্যাপারে অন্যান্য মুসল্লিরাও দায়িত্বশীল ও সংযত আচরণ করতে হবে। কোনো শিশুর অতিরিক্ত দুষ্টমির কারণে নামাজে ব্যাঘাত যাতে না ঘটে, কৌশলে সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

সূত্রঃ news24bd.tv