ঢাকা ১১:২১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬, ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইতিকাফের দিনগুলো হোক প্রযুক্তির অপব্যবহার মুক্ত

news desk
  • আপডেট সময় : ০৩:২৪:২৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
সংবাদ সমাচারের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ইতিকাফ এমন একটি ইবাদত, যেখানে একজন মুমিন দুনিয়ার সব ব্যস্ততা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন হওয়ার চেষ্টা করেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যখন মসজিদে ইতিকাফ অবস্থায় থাকো, তখন তোমরা স্ত্রীদের সঙ্গে সহবাস করো না।’ (সুরা বাকারা আয়াত : ১৮৭) 
মুফাসসিররা বলেন, এই আয়াত ইতিকাফের বৈধতা ও গুরুত্বের স্পষ্ট দলিল। ইমাম কুরতুবি (রহ.) লিখেছেন, এখানে আল্লাহ তাআলা ইতিকাফকে একটি স্বীকৃত ইবাদত হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং তার কিছু মৌলিক বিধানও বর্ণনা করেছেন। 

ইতিকাফ ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নাহ। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবী (সা.) রমজানের শেষ দশক ইতিকাফ করতেন। তাঁর ওফাত পর্যন্ত এই নিয়মই ছিল। এরপর তাঁর সহধর্মিণীগণও (সে দিনগুলোতে) ইতিকাফ করতেন।’ (বুখারি, হাদিস : ২০২৬)
আরেক বর্ণনায় এসেছে, ‘যখন রমজানের শেষ দশক আসত তখন নবী (সা.) তাঁর লুঙ্গি কষে নিতেন (বেশি বেশি ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন) এবং রাত্র জেগে থাকতেন ও পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন।’ (বুখারি, হাদিস : ২০২৪)

এই হাদিসগুলো আমাদের সামনে এই স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে যে, শেষ দশকের প্রতিটি মুহূর্ত নবীজি (সা.) আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য ব্যয় করতেন। কারণ এই সময়েই রয়েছে লাইলাতুল কদরের মতো মহিমান্বিত রাত। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘লাইলাতুল কদর এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।’ (সুরা কদর, আয়াত : ৩)

এই মহিমান্বিত রাতের সন্ধানেই মূলত মুমিনরা ইতিকাফে বসে।কিন্তু আমাদের সময়ের বাস্তবতা একটু ভিন্ন। আজকের পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে বড় ব্যস্ততা হয়ে উঠেছে ডিজিটাল জগত্। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বার্তা, ভিডিও ও নানা অনলাইন ব্যস্ততা মানুষের সময় ও মনোযোগকে এমনভাবে দখল করে ফেলেছে যে অনেক সময় মানুষ নিজের অজান্তেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা এসবের মধ্যে ডুবে থাকে।

এই বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন সামনে আসে যে, যদি ইতিকাফে বসেও একজন মানুষ সারাক্ষণ ফোন, মেসেজ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যস্ত থাকে, তাহলে ইতিকাফের সেই গভীর আধ্যাত্মিকতা কি সত্যিই অর্জিত হবে?

প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, ‘ইতিকাফের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মানুষের অন্তরকে আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণভাবে নিবিষ্ট করা, যাতে মানুষের চিন্তা ও মনোযোগ সবকিছু আল্লাহর স্মরণে কেন্দ্রীভূত হয়।’ (যাদুল মাআদ ২/৮৭) 

অর্থাত্ ইতিকাফ এমন একটি অবস্থা, যেখানে মানুষের হূদয় দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। কিন্তু সেই সময়টিই যদি ডিজিটাল বিভ্রান্তিতে ভরে যায়, তাহলে ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

ইমাম গাজালি (রহ.) মানুষের হূদয়ের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, মানুষের অন্তর সবসময় বিভিন্ন চিন্তা ও আকর্ষণে ব্যস্ত থাকে। যখন মানুষ একান্ত নির্জনতায় আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন হয়, তখনই সেই হূদয় পরিশুদ্ধ হতে শুরু করে। (আসরারুস সওম লি ইমাম গাজালি)

এই কারণেই ইতিকাফের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো নিভৃততা। মসজিদের শান্ত পরিবেশে বসে কোরআন তিলাওয়াত করা, দীর্ঘ সময় সিজদায় থাকা, নিজের জীবনের ভুলগুলো স্মরণ করা এবং আল্লাহর কাছে কান্নাভেজা দোয়ায় ক্ষমা প্রার্থনা করা; এই দৃশ্যই ইতিকাফের প্রকৃত চিত্র।

একজন মুমিন যখন মসজিদের নির্জনতায় বসে নিজের জীবনের দিকে তাকান, তখন তিনি উপলব্ধি করেন; জীবনের কতো সময় অবহেলায় নষ্ট হয়ে গেছে। কতো নামাজে মন ছিল না, কতো গুনাহ অবহেলায় হয়ে গেছে, কতো সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। এই উপলব্ধি থেকেই তার হূদয় নরম হয়ে যায় এবং তিনি আল্লাহর দরবারে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

তাই ইতিকাফের সময় আল্লাহর কাছে নিজের সব ত্রুটি, বিচ্যুতি ও অক্ষমতার কথা স্বীকার করে বিশুদ্ধ তাওবা করা উচিত। 

কিন্তু এই গভীর আধ্যাত্মিক মুহূর্তগুলো যদি সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যস্ততা, মোবাইল স্ক্রিনের আলো বা অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগে কাটিয়ে দেন; তাহলে ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
তাই ইতিকাফের দিনগুলোতে নিজেকে যতটা সম্ভব মোবাইল, ট্যাব ইত্যাদির মতো ডিভাইস থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা উচিত। এসময় মুমিনের ভাবনার সবটুকুতে যেন একমাত্র আল্লাহ থাকেন, সে চেষ্টা করা উচিত। সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় কাজ, দুনিয়াবী চিন্তা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া উচিত।
হয়তো আল্লাহর ভয়ে ফেলা একটি অশ্রুফোটা, একটি সিজদাই মুমিনের সারা জীবনের গুনাহগুলো ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে পারে। 

অতএব, আমাদের সবার উচিত, বিশেষ করে ইতিকাফকারীদের, রমজানের বাকি সময়গুলোকে পরিপূর্ণ আল্লাহর জন্য উত্সর্গ করার চেষ্টা করা। 

লেখক : প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
saifpas352@gmail.com

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

ইতিকাফের দিনগুলো হোক প্রযুক্তির অপব্যবহার মুক্ত

আপডেট সময় : ০৩:২৪:২৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬

ইতিকাফ এমন একটি ইবাদত, যেখানে একজন মুমিন দুনিয়ার সব ব্যস্ততা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন হওয়ার চেষ্টা করেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যখন মসজিদে ইতিকাফ অবস্থায় থাকো, তখন তোমরা স্ত্রীদের সঙ্গে সহবাস করো না।’ (সুরা বাকারা আয়াত : ১৮৭) 
মুফাসসিররা বলেন, এই আয়াত ইতিকাফের বৈধতা ও গুরুত্বের স্পষ্ট দলিল। ইমাম কুরতুবি (রহ.) লিখেছেন, এখানে আল্লাহ তাআলা ইতিকাফকে একটি স্বীকৃত ইবাদত হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং তার কিছু মৌলিক বিধানও বর্ণনা করেছেন। 

ইতিকাফ ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নাহ। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবী (সা.) রমজানের শেষ দশক ইতিকাফ করতেন। তাঁর ওফাত পর্যন্ত এই নিয়মই ছিল। এরপর তাঁর সহধর্মিণীগণও (সে দিনগুলোতে) ইতিকাফ করতেন।’ (বুখারি, হাদিস : ২০২৬)
আরেক বর্ণনায় এসেছে, ‘যখন রমজানের শেষ দশক আসত তখন নবী (সা.) তাঁর লুঙ্গি কষে নিতেন (বেশি বেশি ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন) এবং রাত্র জেগে থাকতেন ও পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন।’ (বুখারি, হাদিস : ২০২৪)

এই হাদিসগুলো আমাদের সামনে এই স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে যে, শেষ দশকের প্রতিটি মুহূর্ত নবীজি (সা.) আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য ব্যয় করতেন। কারণ এই সময়েই রয়েছে লাইলাতুল কদরের মতো মহিমান্বিত রাত। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘লাইলাতুল কদর এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।’ (সুরা কদর, আয়াত : ৩)

এই মহিমান্বিত রাতের সন্ধানেই মূলত মুমিনরা ইতিকাফে বসে।কিন্তু আমাদের সময়ের বাস্তবতা একটু ভিন্ন। আজকের পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে বড় ব্যস্ততা হয়ে উঠেছে ডিজিটাল জগত্। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বার্তা, ভিডিও ও নানা অনলাইন ব্যস্ততা মানুষের সময় ও মনোযোগকে এমনভাবে দখল করে ফেলেছে যে অনেক সময় মানুষ নিজের অজান্তেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা এসবের মধ্যে ডুবে থাকে।

এই বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন সামনে আসে যে, যদি ইতিকাফে বসেও একজন মানুষ সারাক্ষণ ফোন, মেসেজ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যস্ত থাকে, তাহলে ইতিকাফের সেই গভীর আধ্যাত্মিকতা কি সত্যিই অর্জিত হবে?

প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, ‘ইতিকাফের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মানুষের অন্তরকে আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণভাবে নিবিষ্ট করা, যাতে মানুষের চিন্তা ও মনোযোগ সবকিছু আল্লাহর স্মরণে কেন্দ্রীভূত হয়।’ (যাদুল মাআদ ২/৮৭) 

অর্থাত্ ইতিকাফ এমন একটি অবস্থা, যেখানে মানুষের হূদয় দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। কিন্তু সেই সময়টিই যদি ডিজিটাল বিভ্রান্তিতে ভরে যায়, তাহলে ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

ইমাম গাজালি (রহ.) মানুষের হূদয়ের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, মানুষের অন্তর সবসময় বিভিন্ন চিন্তা ও আকর্ষণে ব্যস্ত থাকে। যখন মানুষ একান্ত নির্জনতায় আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন হয়, তখনই সেই হূদয় পরিশুদ্ধ হতে শুরু করে। (আসরারুস সওম লি ইমাম গাজালি)

এই কারণেই ইতিকাফের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো নিভৃততা। মসজিদের শান্ত পরিবেশে বসে কোরআন তিলাওয়াত করা, দীর্ঘ সময় সিজদায় থাকা, নিজের জীবনের ভুলগুলো স্মরণ করা এবং আল্লাহর কাছে কান্নাভেজা দোয়ায় ক্ষমা প্রার্থনা করা; এই দৃশ্যই ইতিকাফের প্রকৃত চিত্র।

একজন মুমিন যখন মসজিদের নির্জনতায় বসে নিজের জীবনের দিকে তাকান, তখন তিনি উপলব্ধি করেন; জীবনের কতো সময় অবহেলায় নষ্ট হয়ে গেছে। কতো নামাজে মন ছিল না, কতো গুনাহ অবহেলায় হয়ে গেছে, কতো সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। এই উপলব্ধি থেকেই তার হূদয় নরম হয়ে যায় এবং তিনি আল্লাহর দরবারে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

তাই ইতিকাফের সময় আল্লাহর কাছে নিজের সব ত্রুটি, বিচ্যুতি ও অক্ষমতার কথা স্বীকার করে বিশুদ্ধ তাওবা করা উচিত। 

কিন্তু এই গভীর আধ্যাত্মিক মুহূর্তগুলো যদি সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যস্ততা, মোবাইল স্ক্রিনের আলো বা অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগে কাটিয়ে দেন; তাহলে ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
তাই ইতিকাফের দিনগুলোতে নিজেকে যতটা সম্ভব মোবাইল, ট্যাব ইত্যাদির মতো ডিভাইস থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা উচিত। এসময় মুমিনের ভাবনার সবটুকুতে যেন একমাত্র আল্লাহ থাকেন, সে চেষ্টা করা উচিত। সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় কাজ, দুনিয়াবী চিন্তা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া উচিত।
হয়তো আল্লাহর ভয়ে ফেলা একটি অশ্রুফোটা, একটি সিজদাই মুমিনের সারা জীবনের গুনাহগুলো ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে পারে। 

অতএব, আমাদের সবার উচিত, বিশেষ করে ইতিকাফকারীদের, রমজানের বাকি সময়গুলোকে পরিপূর্ণ আল্লাহর জন্য উত্সর্গ করার চেষ্টা করা। 

লেখক : প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
saifpas352@gmail.com